বেনারসে তিনদিন ─── বাঁদর, হট চেম্বার আর কৌতূহলী বুড়ো

গিছিলুম বেনারস।‌ ‌‌‌কেন গিছিলুম, কি কত্তে গিছিলুম বলছি।‌ ‌‌‌
আসলে , দুবছর বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পড়ার পর হঠাৎ বোধি লাভ করার মতো মনে হোলো, আরেহ্ বেনারসে তো কিছুই দেখা হলো না! এমনি মন্দির-ফন্দির অনেক আছে।‌ ‌‌‌ ওসবে আমার ততো উৎসাহ নেই।‌ ‌‌‌‌ যেটা দেখতে চাই, সেটা হলো সূর্যোদয়।‌ ‌‌‌ গঙ্গার ওপর।‌ ‌‌‌

সে হুগলী নদী আমাদের ডায়মণ্ড হারবারেও আছে।‌ ‌‌‌ দিব্যি সূর্য দেখা যায়।‌ ‌‌‌‌ কিন্তু বেনারসে কি এক মাহাত্ম্য আছে        লোকে বলে।‌ ‌‌‌ আমি জানি না।‌
তোমরা এক্ষুণি বলবে       “ধুর্ ধুর্, শুধু সূয্যিমামার ওঠবোস দেখতে বেনারস গ্যাছে! পাগোল আর কাকে বলে!” আরে না, আরো কাজ ছিলো।‌ ‌‌‌‌ যাকগে সেসব কথা থাক ।‌ ‌‌‌
হেব্বি ট্রেনজার্নি করে পৌঁছেছি।‌ ‌‌‌ থাকবো কোথায়? হোটেলগুলো বলছে রুম নেই সস্তায়।‌ ‌‌‌ তো ওই ইউনিভার্সিটির কাছেই আড়াইশো টাকা পার নাইট রেটে পেলুম একটা রুম‌।‌ ‌‌‌‌ আরেক বন্ধু সঙ্গে ছিলো।‌ ‌‌‌ দুজনে কষ্টেসৃষ্টে ভাগাভাগি করে আছি একটা সিঙ্গল্ রুমে ।‌ ‌‌‌
প্রথমে তো রুমে ঢুকেই দুজনে বিছানায় সটান।‌ ‌‌‌ একদম বেঁহুশ।‌ ‌‌‌‌ এমনিতে রুমটা খুব একটা ভালো না।‌ ‌‌‌ ছোটো তো বটেই, চারতলার ওপর।‌ ‌‌‌‌ গরম খুব।‌ ‌‌‌ বুড়ো ম্যানেজার অবশ্য গোড়াতেই বলে দিয়েছিলো।‌ ‌‌‌
যাগ্ গে।‌ ‌‌‌ ট্রেনজার্নি করে দুজনেই হেব্বি ক্লান্ত।‌ ‌‌‌  ঘুম হলো জব্বর।‌ ‌‌‌ ঘুমিয়ে টুমিয়ে উঠে গেলুম ম্যানেজারের কাছে।‌ ‌‌‌ বুড়ো আমার ভোটার আই কার্ডটা নিয়ে রেখেছে।‌ ‌‌‌ কি? না, ওটার জেরক্স না দিলে ওটা নাকি ও রেখে দেবে ওর প্রপিতামহের সম্পত্তি হিসেবে।‌ ‌‌‌ গিয়ে চাইলুম কার্ডটা।‌ ‌‌‌

      “দাও, গিয়ে জেরক্স করে নিয়ে আসি”

সে আমার দিকে টাক ওপরে তুলে ঘোলা চোখ কপালে তুলে এমন করে চাইল যেন আমি অন্য বাড়ির ছাদ ডিঙিয়ে ওর সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছি।‌ ‌‌‌ চিনতেই পারে না! তা মিনিট দূয়েক ধরে সন্দেহজনক ভাবে তাকিয়ে, এটা সেটা কোশ্চেন করে, তারপর তার প্রত্যয় হলো যে আমার ভোটার কার্ডটা ওর কাছেই আছে।‌

আমি ভাবলাম, ড্রয়ার খুলবে, বের করবে আর দেবে।‌ ‌‌‌ ও বাবা! দশ-বারোটা কার্ড নিয়ে দেখি টোয়েণ্টি নাইন খেলার মতো সাজিয়েছে         একটা করে দেখছে, আর মেলাচ্ছে আমার মুখের সাথে।‌ ‌‌‌ একটাও মিলল না।‌ ‌‌‌

আরে ধুর্ ।‌ ‌‌‌ সরকারি লোক ফটো তুলেছিলো ভোটার কার্ড করানোর সময়।‌ ‌‌‌‌ যখন ফটো তুলছিলো তখনি মনে হয়েছিলো, এ আগে ক্যামেরা ধরেছে কিনা সন্দেহ আছে।‌ ‌‌‌ ফটো এসচে সেইরম।‌ ‌‌‌ রামু ধোপার মতো একটা লোক আমার কার্ডে চেয়ে থাকে।‌

তা অমি নিজেই বের করে দিলাম       “এইটা”

উল্টো দিক থেকেও স্পট করা খুবই সোজা।‌ বাকিগুলো তো হিন্দি আর ইংরিজিতে লেখা। আমারটাতেই খালি বাংলা আর ইংরিজি।‌

বুড়ো (  অ্যাই! বয়স্ক লোক বলবে ! বয়সে বড়ো হয় না ?! ) ভুরু-টুরু কুঁচকে আমাকে আর কার্ডের রামু ধোপাকে মেলাচ্ছে।‌ হতাশ হয়ে রেজিস্টার খুলে ঠিকানা মেলালো।‌ ‌‌‌ তারপরও দেখি দিচ্ছে না!

      “কি চাই ?”

      “কিতনা দিন রহনা হ্যায়?”

এর আগে ঢোকার সময় ৫০০ টাকা  অ্যাডভান্স নিয়েছে খুড়ো।‌ ‌‌‌ তখনি বলেছি, দুদিনের জন্য বুক করছি, পরে দরকার হলে এক্সটেণ্ড করতে পারি সাতদিন অবধি।‌ ‌‌‌ আবার কোশ্চেন কেন?

       “দো দিন।‌ ‌‌‌ বাদমে দেখা যায়েগা”

       “কিস কামসে আয়ে হো ?”
আবার কোশ্চেন! ধাঁ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল।‌ ‌‌‌ টাকা দেবার সময়ই বলেছি , লিখেও দিয়েছি, যে আমরা সব বি.এইচ.ইউ এর শান্তশিষ্ট ছেলেপুলে।‌ ‌‌‌ পরীক্ষা শেষ।‌ ‌‌‌ কন্ট্রোলার অফিসে রেজাল্ট সার্টিফিকেট ফর্ম এসব কাজ আছে।‌ ‌‌‌ আমি কাম নিয়ে আসি, কি , ক্রোধ, লোভ, মোহ নিয়ে আসি তাতে তোর কি দরকার রে বিটলে বুড়ো?

তা রাগ চেপে হাসি মুখে ব্যাখ্যান করলাম ইতি বৃত্তান্ত।‌ ‌‌‌ আজকাল আবার টেররিস্ট-ফিস্ট এরমভাবে লুকিয়ে তাকে কিনা! তাই একগাদা কোশ্চেন করছে হয়তো।‌ ‌‌‌‌ এতো কথার পরে ফেরত দিলো আমার কার্ডটা ।‌ ‌‌‌ কার্ডে বাংলা-ফাংলা দেখে তো আরেক চোট ভুরু কোঁচকানো………………….
বাইরে বেরিয়ে পেটপুরে খেলুম আগে।‌ ‌‌‌ তারপর জেরক্স হলো।‌ ‌‌‌ এখানে আবার কেউ জেরক্স বোঝে না।‌ ‌‌‌ ফটোকপি বলতে হবে।‌ ‌‌‌ ফটোকপি জমা দিলুম বুড়োর কাছে।‌ ‌‌‌ সেটা হাতে নিয়ে আবার কোশ্চেন,

      “আপকা এয়সা কেয়া রেজাল্ট আ গয়া কে,  আপ উসে লেনে পাচ দিন পহলে আ গয়ে?”  আবার সেই টাক উপরে তুলে ঘোলা চোখ কপালে উঠিয়ে………..

আমি এদিক সেদিক লাঠি খুঁজছি।‌ ‌‌‌ মার্ডার হয়ে যাবে এবার আমার হাতে!

এতক্ষণ ধরে বসে বসে বুড়ো লজিক্যাল অ্যানালাইসিস করছিল।‌ ‌‌‌ টু প্লাস টু ইজিকাল্টু ফাইভ করে ফেলেছে        এ ছেলে দুটোর রেজাল্ট পাঁচ দিন  পরে, এরা এখন চলে এসেছে, অতএব গোলমাল হ্যাজ্ ।‌ ‌‌‌
এবার শান্ত স্বরে বললাম, “বেশ করেছি।‌”দরকার পড়লে আরো কদিন থাকবো।‌”  মুখে তখন আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের ডিটারেমিনেশান।‌ ‌‌‌
বুড়ো এবার কথা না বাড়িয়ে জেরক্স কাগজটাতে সই করলো।‌ ‌‌‌‌ প্রচুর সময় নিয়ে, ধীরেএএ  ধীরেএএ।‌ ‌‌‌ নিজের নামের একটা করে অক্ষর লেখে আর বাইরের দিকে, ছাদের দিকে চায়।‌ ‌‌‌ যেন পরের অক্ষরটা পূর্বজন্মের স্মৃতি থেকে উদ্ধার করছে।‌ ‌‌‌ তো এসব হয়ে টয়ে যাওয়ার পর কাগজ ঢুকিয়ে তাকাচ্ছে দেখি আমার দিকে।‌ ‌‌‌
আমি বললাম, “অওর কুছ?”

      “কিতনা দিন রহনা হ্যায়‌?‌” (‌টাক উপরে ঘোলা চোখ কপালে )

ই ই  ই ই ই ই ই ই ই  ই ই ই ই  ই ই ই ই ই ই ই ই!!!!!!!!!!!!!!!!

এবার কড়া গলায় বললাম, “কোই ধিক্কত্ হ্যায় আপকো‌?‌ রুম দেনে মে ?‌”‌
অবাক কাণ্ড! এবার বুড়ো অমায়িক ! পুরো অমায়িক!  “নেহি নেহি, ধিক্কত্ ক্যায়সা!”
হুঁহুঁ, টাকা নিচ্ছ, ধিক্কত্ থাকবে কি করে?

সেদিন তো শুয়ে বসে রেস্ট নিতেই কেটে গেল।‌ ‌‌‌ রাত্রের খাবার-দাবারও  টুক্ করে খেয়ে এসেছি বাইরে বেরিয়ে।‌ ‌‌‌ খেতে যাবার সময় আর ম্যানেজারকে দেখিনি।‌ ‌‌‌ বুড়ো বোধহয় সন্ধে সন্ধে ঘুমিয়ে পড়ে।‌ ‌‌‌ সারাদিন ধরে সন্দেহ করে করে, লজিক্যাল ক্যালকুলেশান করে করে, আর ঘোলা চোখ টানতে পারে না বেশী রাত অবধি।‌ ‌‌‌
পরদিন সকাল হল।‌ ‌‌‌ ও হ্যাঁ, ভোরের দিকে কিছু বাঁদর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে আমাদের দেখতে এসেছিল।‌ ‌‌‌  নতুন জায়গায় ফ্ল্যাট কিনলে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন আলাপ করতে আসে যেমন।‌ ‌‌‌ ছাদটা তো ওদেরই রাজত্ব।‌ ‌‌‌ আমরাই উদবাস্তুর মতো একটা ঘর দখল করেছি।‌ ‌‌‌
বেনারসে বাঁদর খুবই কমন।‌ ‌‌‌ আমাদের ডায়মণ্ড হারবারের দিকে দেখা যায় না এদের।‌ ‌‌‌ তবে আমাদের বাড়িতে দুটো হনুমান প্রতিবছর একবার করে ভিজিট দিয়ে যেত।‌ ‌‌‌ কোথায় থাকতো জানিনা।‌ ‌‌‌ বাঁদর হনুমানে আমার বিশাল ভয়।‌ ‌‌‌ ওই যে বেশী বেগড়বাঁই করলে তেড়ে এসে দাঁত-ফাঁত দেখায় না? কামড়ে দিলে আর দেখতে হবে না! কুকুর এদের থেকে অনেক ভালো।‌ ‌‌‌ অযথা দাঁত দেখায় না।‌ ‌‌‌ বাঁদর আর কুকুরে অবশ্য তুলনা করা উচিত নয়।‌ ‌‌‌ ঠাকুর পাপ দেবে।‌ ‌‌‌ বাঁদর হইল গিয়া আমাগো ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদার ঠাকুরদার …………………………………….. আপটু ইনফিনিটি।‌ ‌‌‌ হবে হয়তো।‌ ‌‌‌
তো যাইহোক, পরদিন সকালে দেরী করে ঘুম ভাঙল।‌ ‌‌‌ মানে দশটা।‌ ‌‌‌ উঠে ঠিক করলুম , আজ আর শুয়ে বসে কাটালে চলবে না, কাজ করতে হবে, কাজ।‌ ‌‌‌ তাড়াতাড়ি লাঞ্চ করে ইউনিভার্সিটি রওনা দেবো।‌ ‌‌‌ খাবার দোকান নীচেই আছে।‌ ‌‌‌ পঞ্চাশ টাকায় থালি দেয়।‌ ‌‌‌ থালি মানে থালা তো দেবেই, তার ওপরে ভাত, ডাল, কপি বা শাকের ঘ্যাঁট, পনিরের তরকারি, পেঁয়াজ, আচার আর একটা গাজরের টুকরো।‌ ‌‌‌ ইচ্ছে হলে ছটাকা দিয়ে একটা পাঁপড়ও নিয়ে নি।‌ ‌‌‌ তোফা খাওয়া।‌ ‌‌‌ “সিরফ চাওল রহেগা” বললে এরম দেবে।‌ ‌‌‌ আর, কোনো কাস্টোমাইজেশান না চাইলে কিচ্ছু বলতে হবে না।‌ ‌‌‌ ভাত একটু কমিয়ে একগাদা রুটি দেবে সাথে।‌ ‌‌‌ রুটিগুলো মোটা মোটা, আমার নাপসন্দ।‌ ‌‌‌
খাবার দোকানের দিকে যাচ্ছি, হঠাৎ ফেলুদা হয়ে গেলুম।‌ ‌‌‌ কে যেন ফলো করছে আমাদের!
লস্যির দোকানের সামনে একটু ঘুরে এক ভদ্রলোকের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়লুম।‌ ‌‌ তারপর ক্যাঁক করে চেপে ধরলুম স্পাইটাকে।‌ ‌‌ বাচ্চা স্পাই।‌ ‌‌ সবে নেমেছে।‌ ‌‌ হোটেলের বাচ্চা চাকরটাই ফলো করে আসছিল আমাদের।‌ ‌‌

       “কি চাইরে ব্যাটা‌?‌”

একটু চুপ করে থেকে ভালো করে আমাকে দেখে বলে, “চাবিয়া জমা কিয়ে হে???”
চাবি জমা করবো?! কেন??? কোন দুঃখে? রুম সার্ভিস দেয় নাকি এরা? কাস্টমার রুমে না থাকলে, ঢুকে সাফসুতরো করে দেয় নাকি? নাহ্ না! যাহ্ ! এই কোয়ালিটির হোটেলে এসব হয় নাকি?
এমনিতে তো আমাদের তালা চাবি লাগাইনি।‌ ‌‌ ওদের তালা চাবিই চলছে।‌ ‌‌ ওদের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে নিশ্চয়ই।‌ ‌‌

      “ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বল তো দেখি বাপু”

বালক অম্লানবদনে, “মালিক বোলা, উ দো ছোরা কাঁহা যাওথে, দেখ তো জরা” ( মালিক বলল, ওই দুটো ছেলে কোথায় যাচ্ছে একটু দেখ তো  )
আমি, না, তখন        মানে        কি বলবো বুঝতে পারছি না! এত ক্ষেপে গেছি! ওখানেই শুইয়ে দেবো ভাবছি একে।‌ ‌‌ আমি বাচ্চা ছেলে দেখছি না।‌ ‌‌ দেখছি, বাচ্চা সেজে ওই টেকো বুড়ো ঘোলা চোখে বলছে, “এ ছোরা! চাবিয়া লেকে কাঁহা যাওথে!”

বাচ্চাকে ভালো করে বোঝালুম।‌ ‌‌ বাবুসোনা, মালিককে গিয়ে বলো, দুদিনের জন্য তো নিয়েছি, দুদিন তো হয়নি।‌ ‌‌ এখনই রুম ছাড়ছি না।‌ ‌‌ যে কাজে এসেছি, সেটা সারতে যাচ্ছি।‌ ‌‌‌ রুমে আমাদের জিনিসপত্র আছে।‌ ‌‌ আর কাজ সারতে দুদিনের বেশী লাগতে পারে।‌ ‌‌ সেটা এক্সট্রা বিল করে দিতে।‌ ‌‌
বাচ্চা কি বুঝলো জানি না।‌ ‌‌ হ্যাঁ-হুঁ ও করলো না।‌ ‌‌ একদৃষ্টে চেয়ে রইলো।‌ ‌‌ একটু পর দৌড়ে পালিয়ে গেলো।‌ ‌‌ উফ্! কি লোকজন রে বাবা!

ইউনিভার্সিটিতে কাজকর্ম সেরে ফিরে এলুম।‌ ‌‌ বন্ধু গেলো কফি খেতে।‌ ‌‌ অমি হোটেলে ফিরলুম।‌ ‌‌ ইলেকট্রিক চলে গেছে।‌ ‌‌ এটা বেনারসের খুব বড়ো প্রবলেম।‌ ‌‌ ইউনিভার্সিটির হোস্টেলে যতদিন ছিলুম এসব বুঝতেই পারিনি।‌ ‌‌ মাথার ওপরে থেকে বাবার মতো রক্ষা করে গেছে বি.এইচ.ইউ।‌ ‌‌ পাশের রুমে এক ফ্যামিলি এসচে।‌ ‌‌ কত্তা গিন্নি আর প্রচুর আন্ডা-বাচ্চা।‌ ‌‌ তারা এই গরমেও দরজা জানলা সব বন্ধ করে শোরগোল করচে।‌ ‌‌ ওর মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়িচি কখন।‌ ‌‌ ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড গরমে।‌ ‌‌ রুমে থাকা যাচ্ছে না।‌ ‌‌ বাচ্চা চাকর দেখি উঁকি মারছে জানলা দিয়ে।‌ ‌‌ ফার্স্টে ভেবেছিলুম বাঁদর।‌ ‌‌ তারপর দেখি চুল আছে মাথায়, গায়ে গেঞ্জী।‌ ‌‌

মোবাইলে ব্যালান্স শেষ।‌ ‌‌ দেখি , নিচে দোকান থাকলে ভরিয়ে নেবো।‌ ‌‌ বেরোবার সময় আবার ম্যানেজারের মুখোমুখি।‌ ‌‌

      “কাঁহা যা রহে হ্যায়‌?”

      “ঘুমনে”

      “আপকা উ দোস্ত কাঁহা গয়া।‌ ‌‌ চলে গয়ে ক্যা ?”

      “নেহি”

      “কব্ নিকলনা হ্যায়?”

আরে ধুত্! উত্তর না দিয়ে চলে এলাম।‌ ‌‌ ভাল্ লাগে না এতো উত্তর দিতে।‌ ‌‌

পরদিনের প্ল্যান সানরাইজ।‌ ‌‌ ভোর ভোর উঠে বেরোচ্ছি।‌ ‌‌ বাইরে লোক চলাচল শুরু হয়ে গেছে এর মধ্যেই।‌ ‌‌ কিন্তু গেট বন্ধ।‌ ‌‌‌ বুড়ো তো নেইই, চাকর-বাকরও কেউ নেই।‌ ‌‌ এমনিতে “যানা হ্যায়, নিকলনা হ্যায়” করে জেরবার করে দিচ্ছে, দরকারে কেউ নেই।‌ ‌‌ দরজা ধাক্কাধাক্কি করার পর, এক ব্যাটা বিরক্ত মুখে এসে খুলে দিল।‌ ‌‌

অস্যি ঘাটে চলে এলাম সূর্য ওঠা দেখেতে।‌ ‌‌ সুন্দর দৃশ্য, অতি মনোরম দৃশ্য।‌ ‌‌

Image0712দেখলে মন ভরে যায়।‌ ‌‌ লোকজন স্নান করছে গঙ্গাতে।‌ ‌‌ নদীর ধারে ধারে ছোটো বড় নৌকো বাঁধা আছে।‌ ‌‌ মাঝিগুলো এদিক ওদিক গুলতানি মারছে, আর নতুন লোক দেখলেই “নাও লেনা হ্যায়? নাও লেনা হ্যায়? ” করে বিরক্ত করে মারছে।‌ ‌‌ এক কাপল নৌকো ভাড়া করে মাঝনদীতে গিয়ে প্রেম করে এল।‌ ‌‌ বন্ধু দেদার ছবি তুলে যাচ্ছে।‌ ‌‌ ওখান থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না।‌ ‌



তাও উঠতে হল।‌ ‌‌ রোদ বাড়ছে।‌ ‌‌ আর বসা যায় না।‌ ‌‌ ব্যাক্ টু হোটেল।‌ ‌‌ ম্যানেজারকে পাত্তা না দিয়ে সোজা রুমে যাচ্ছি চারতলায়।‌ ‌‌ তিনতলায় পথ আটকালো বানর সেনা।‌ ‌‌ কোনো সহৃদয় ব্যাক্তি বোধয় আগের রাত্রে কিছু রুটি ফেলেছিলেন ডাস্টবিনে।‌ ‌‌ বাঁদরগুলো বেশ ধৈর্য নিয়ে রুটির টুকরোগুলো সিঁড়ি ভর্তি করে ছড়িয়েছে।‌ ‌‌ বাঁদর কি আর সাধে বলে! এবারে  ভোজ চলছে।‌ ‌‌ একটা গোদা বাথরুমে ঢুকে গেলো।‌ ‌‌ কল চালালো।‌ ‌‌ জল খেলো।‌ ‌‌ তারপর ওখানেই বসে থাকল।‌ ‌‌ সিঁড়িতে উঠতে যাবো, হবে না! প্রভুরা এখন খাচ্ছেন।‌ ‌‌ ওঁদের ডিঙিয়ে যাওয়া যাবে না! অনুনয়-বিনয়-অভিনয়, আকুতি-কাকুতি-মিনতি, সব ট্রাই করলাম।‌ ‌‌

      “বাবা সোনারা, একটু যেতে দাও।‌ ‌‌ কলা দেবো, ক্ষীর দেবো।‌ ‌‌ একটু যেতে দাও”

গোদা গেল ক্ষেপে।‌ ‌‌ দুইলাফে আমার সামনে এসে হাঁ করে দেখালো, বেশি কথা বললে গিলে নেবে।‌ ‌‌ আগেই বলেছি, বাঁদরে আমার বিশাল ভয়।‌ ‌‌ কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গেলুম।‌ ‌‌
অগত্যা! এবার এক্সটারনাল হেল্প লাগবে।‌ ‌‌ নীচে গিয়ে ম্যানেজারকে বললুম,

      “দেখুন না, রুমে যেতে পারছি না, কাউকে দিয়ে সিঁড়ির বাঁদরগুলো একটু হটিয়ে দিন না।‌”

      “বান্দর????!!!! সিঁড়িমে‌ ???!!!”

নাহ্! তোমার বাবা বসে আছে সিঁড়িতে! অ্যামোন এক্সক্ল্যামেশান দিচ্ছে যেন বাঁদর সিঁড়িতে বসতেই পারে না।‌ ‌‌ এমনকি, বাঁদর এই হোটেলে আসতেই পারে না।‌ ‌‌ সেই টাক উপরে তুলে ঘোলা চোখ কপালে তুলে অবিশ্বাসের দৃষ্টি!
একটা ছেলেকে ম্যানেজ করে নিয়ে চললুম বানরসেনা পরাজিত করতে।‌ ‌‌ সে দুবার লাঠি ঘোরাতেই বাঁদরের দল বাঁদরামি ছেড়ে পালাল।‌ ‌‌ প্রাণ থাকলে রুটি পরে পাওয়া যাবে।‌ ‌‌ গোদা আমাকে একবার মেপে নিয়ে দুলাফে ছাদে, তিনলাফে অদৃশ্য হল।‌ ‌‌

সন্ধের দিকে বেড়াতে বেরিয়েছিলুম।‌ ‌‌ অস্যি ঘাট যেতে একটু দেরি হয়ে গেল।‌ ‌‌ সূর্য ডুবে গেছে।‌ ‌‌ ঘাটে ঘাটে আরতি হছে।‌ ‌‌ গঙ্গার পাড়ে বসে থাকতে ভালো লাগে।‌ ‌‌ সুন্দর হাওয়া।‌ ‌‌ অন্য ঘাটগুলোতে সারি দিয়ে আলো জ্বলছে।‌ ‌‌
হোটেলে ফিরে কি গরম! একবার স্নান করতে হবে।‌ ‌‌ ঠিক করেছি এবার ফিরে যাবো।‌ ‌‌ কাজকর্ম তো প্রায় হয়েই গেছে।‌ ‌‌ ট্রেনের খুব চাপ চলছে।‌ ‌‌ টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না।‌ ‌‌ আমার টিকিট হয়নি।‌ ‌‌ বন্ধুটি ওয়েটিং-এ কেটে ছিলো।‌ ‌‌ ওরটা কনফার্ম হয়ে গেছে।‌ ‌‌ টিকিট হোক বা না হোক, এ হোটেলে আর থাকবো না।‌ ‌‌
একটা ছেলে এলো।‌ ‌‌ “তোমার আবার কি চাই?”

      “প্যায়সা জমা কর দিজিয়ে”

      “প্যায়সা তো কবকা জমা কর চুকা হু বেটা।‌ ‌‌ এক্সট্রা যো বিল হুয়া হ্যায়, যব রুম ছোড়েঙ্গে, দে দেঙ্গে”
ছেলেটা ইতস্তত করছে।‌ ‌‌ আমি চেয়ে আছি তার দিকে।‌ ‌‌

      “মালিক পুছ রহে হ্যায়, কব নিকলনা হ্যায়?”

ব্যাটা বুড়ো শালিক! আমাদের পিছনে পড়ে আছে খালি! বললুম, “আজ রাত তিন বজে নিকলেঙ্গে।‌ ‌‌ যাও মালিককো যাকে বোলো থোড়া দের বাদ সব হিসাব ঠিক কর দেঙ্গে।‌”
রাত তিনটের সময় শুনে ছেলেটার মুখ বেজার হয়ে গেল।‌ ‌‌ রাত তিনটের সময় ওকেই উঠে গেট খুলে দিতে হবে।‌ ‌‌
ছেলেটা নিচে নেমে গেল।‌ ‌‌ তিনতলা থেকে বুড়ো ম্যানেজারের গলা ভেসে আসতে লাগল।‌ ‌‌

      “কব নিকলনা হ্যায়? কব নিকলনা হ্যায়?”
আমি রুমে ঢুকে গেলুম।‌ ‌‌রাতে যখন খেতে বেরুলুম, তখন বুড়োকে জিজ্ঞেস করলুম, “কত এক্সট্রা বিল হয়েছে বলে দিন, আজ রাত্তির তিনটের সময় রুম ছেড়ে দেবো।‌ ‌‌”
মুখের দিকে চেয়ে থেকে থেকে কোশ্চেন করে,       “কব নিকলনা হ্যায়?”

      “রাত তিন বজে”

পয়সা টয়সা দেওয়া হল।‌ ‌‌ তারপর বলে, “কিতনা বজে নিকলনা হ্যায়?”

      “আরে বোল তো রহে হ্যায়, রাত তিন বজে”

      “রাতকো তিন বজে নিকল যায়েঙ্গে???”

      “হাঁ, তো?”

      “নেহি বাস পুছ রহে হ্যায়”

ধুত্তোর নিকুচি করেছে! খাওয়া দাওয়া করে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লুম।‌ ‌‌ তিনটেয় এলার্ম দেওয়া ছিলো।‌ ‌‌ এতো গরম যে ঘুমই হল না।‌ ‌‌ দুটোর সময় উঠে বেরিয়ে পড়লুম।‌ ‌‌ “কব নিকলনা হ্যায়” তখন ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকাচ্ছে।‌ ‌‌
মুঘলসরাই পৌঁছে দিয়ে এলুম বন্ধুকে।‌ ‌‌ দেড় ঘণ্টা মতো লাগে অটোতে।‌ ‌‌ আমার টিকিট হয়নি।‌ ‌‌ বন্ধু চলে গেলো।‌ ‌‌ আমি আরো কদিন অন্য হোটেলে থেকে তারপর যাবো ঠিক করলাম।‌ ‌‌ সে আরেক গল্প।‌ ‌‌ অন্যদিন বলবো।‌ ‌

Advertisements

Image

7 Comments (+add yours?)

  1. phoxis
    Jun 13, 2013 @ 12:04:32

    শুধু “ফাটোকাঁপী” নয় “ফাটো-ইসটেট” ও বটে

    আরো কিছু ছবি ঘাট এর : http://wp.me/p2SLkl-43

    Reply

    • barshan
      Jun 13, 2013 @ 18:07:44

      ঠিক ঠিক, ফটোকপি নয়, ফাটোকাঁপী অথবা ফাটো-ইসটেট বলে। ঘাটের ছবি গুলোর জন্যে ধন্যবাদ।

      Reply

  2. Sharmila
    Jun 14, 2013 @ 23:17:52

    darun likhecho…….

    Reply

  3. Snigdha Das
    Dec 23, 2013 @ 22:25:27

    khub valo likhecho…. keep it going!! 🙂

    Reply

  4. Koyel
    May 19, 2014 @ 16:07:22

    অসম্ভব enjoy করেছি গো।পড়তে পড়তে মাঝ-মাঝে রীতিমতো জোরে আওয়াজ করে হেঁসে উঠেছি।Your presentation is just superb bro….keep it up…^_^

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: