মাতালদের বাসে

এই যে নমস্কার!

অনেকদিন পর লিখতে বসলাম। জানি না এখনো কেউ আমার ব্লগ পড়ে কিনা। নিয়মিত পোস্ট করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেমালুম বেপাত্তা হয়ে যাবার জন্যে ক্ষমা চাইছি। আসলে কি বলতো, একদম সময় পাই না। কখনো বা সময় পেলাম অল্প, কিন্তু মুড থাকে না। আর মুড না থাকলে কিছুই হয় না। এই সময়+মুড এর কম্বিনেশানটা পাওয়া খুব দুষ্কর হয়ে পড়ছে দিন দিন।

আজ লেখার একটু সময় পাওয়া গেছে। হালকা হালকা মুডও আছে। আজ একটু লিখি। আজ আবার বেনারসের কথা মনে পড়ছে। দুবছর ছিলাম বেনারসে।

একবার বারানসী থেকে মোগোলসরাই স্টেশান আসছিলাম। একাই আসছিলাম। ট্রেন ধরব বলে। রাতের ট্রেন। আমি বেরিয়েছি ৯টা মত হবে। অটো পাচ্ছি না। দাঁড়িয়ে আছি। দেখি একটা ছোটো মত বাস এসেছে।

বাস-ফাস কম চলে ওখানে। তাও পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। প্রথমে উঠতে চাইছিলাম না। তারপর দেখি অনেক লোক উঠছে আর একটা সীট ফাঁকাও আছে জানালার ধারে। উঠে পড়লাম। একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে বাসের মধ্যে। কন্ডাকটার গোটা বাস জুড়ে হম্বিতম্বি করে বেড়াচ্ছে। গলা শুনেই বোঝা যাছে গলাঅব্দি টেনে ফুল মাতাল হয়ে আছে। বাস ড্রাইভার স্টিয়ারিং এর সামনে ভূতের মতো বসে আছে একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে। শীতকাল ছিল তখন| কন্ডাকটারের হম্বিতম্বি থামলে তবে বাস ছাড়বে|

 

হম্বিতম্বি থামলো। বাস ছাড়ল। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল। জ্যাকেটটা চাপিয়ে জুত করে বসলাম। একটু পাশের লোকটির সাথে গল্প গুজব করছি। এই “আপনি কোথায় যাবেন আমি কোথায় যাবো হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ” টাইপের খেজুরে আলাপ আরকি।
আমার হাতে বাবা বিশ্বনাথ মন্দিরের নতুন ধাগা দেখে লোকটির মন্তব্য আমি নিশ্চয় খুব ধার্মিক। আমার বন্ধুর দাদা একবার ট্রেনে মহাভারত পড়তে পড়তে যাচ্ছিল। তো একটা লোক এইরকম মন্তব্য করেছিল কি “আপ বহোত ধারমিক লাগতে হো” । দাদা উল্টে বলে “কই না তো”। তাতে প্রশ্নকর্তা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। আমি কি বলব ভাবছি। “ওই আর কি ওই এক রকম হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ” বলে কাটিয়ে গেলাম।

মাতাল কন্ডাকটার এখনো লাফালাফি করছে। টিকিট কাটার পালা চলছে এখন। বিশাল ঝক্কির কাজ। কে টিকিট কাটেনি, বলছে কেটেছি। দেখতে চাইলে জানালার দিকে তাকিয়ে বাবা মহাদেবের মতো বসে আছে। কেউ বা দিচ্ছি দেব দিলাম করে করে ঘোরাচ্ছে বারবার। কেউ বা পাশের লোকের সাথে উত্তরপ্রদেশের উন্নতি নিয়ে এমন গল্পে ব্যস্ত, টিকিট যে কাটতে হয় সে খেয়ালই নেই। আর যার সাথে গল্প করছে সে দেখাচ্ছে যে এর সাথে যেন কতদিনের চেনা। কেউ চিল্লাছে কেউ গালি দিচ্ছে, কাঁইমাঁই কাঁইমাঁই কাঁইমাঁই কাঁইমাঁই|
মদ খেয়েছে বলে কন্ডাকটারকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। এমন অবস্থার মাঝখানে টিকিট কাটার দায়িত্ব থাকলে যে কেউ পাগল হয়ে যাবে। এ তো সবে মাতাল হয়েছে। পাগল হওয়ার ফার্স্ট স্টেপ।
আমার পাশের লোকটা আগে টিকিট কেটেছিল। তার কাছে এসে কন্ডাক্টার আবার চাইছে। লোকটা টিকিটটা বের করে দেখিয়ে দিল। তখন কন্ডাক্টারের মনে অনুশোচনা জন্মালো। আর মাতাল থাকার জন্যে অনুশোচনাটা একটু বেশি জন্মালো। সে দেখি, একবার বাসের পিছন দিকে চলে যাচ্ছে বাবা মহাদেবের মত ধ্যানগ্রস্ত লোকটাকে তাগাদা দেবার জন্যে, আবার একটু পরেই ফিরে এসে ক্ষমা চেয়ে যাচ্ছে। বারবার এরকম করছে।
এরকম করে কিছুক্ষণ কাটল। বাবা মহাদেবকে এখনো টলানো যায় নি। ভাবটা এরকম যে অনেকটা রাস্তা তো চলেই এসেছি, এবার নামিয়ে দিলেই বা কি। আরেকটা লোক পনের টাকা দেবার বদলে পাঁচ টাকা দিচ্ছে। কন্ডাক্টার বলছে নামিয়ে দেবে। তখন লোকটা মহাদেবের দিকে দেখাচ্ছে যে, ও যে বিনা ভাড়াতে যাচ্ছে তার বেলা? আবার কাঁইমাঁই কাঁইমাঁই। অনেকক্ষণ কাঁইমাঁই চলার পর ড্রাইভার মুখ খুলল যে ভাড়া না দিলে গাড়ি চালাবে না।কথা শুনে যা বোঝা গেল, সেও পুরো মাতাল। সর্বনাশ! রাতের বেলা বাসে যাচ্ছি আর বাস চালাচ্ছে একটা মাতাল! ভয় পেয়ে গেছি তখন । পাশের লোকটা এক গাল পান নিয়ে বলে “ডেরাইভার কনডাকটার দোনো হি পুরা পিকে রাখ্খে হ্যায় হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ”| যেন কোনো ব্যাপারই নয় এসব!
যাইহোক বাস চলছে। মহাদেব যথারীতি একটা পয়সাও ঠেকায়নি, সাংসরিক জিনিসের প্রতি তার মোহ নেই। শুধু মাঝেমধ্যে হিংসুটে লোকটার দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে। হিংসুটে পাঁচ টাকা থেকে দশ টাকাতে উঠেছে। তর্কাতর্কি চলছে এখনো। আমি ভয়ে ভয়ে আছি। ড্রাইভারটা যেন ঠিকঠাক চালায়, এক্সিডেন্ট না করে।
ভালই চলছিল। মেন রোড ধরবে ধরবে করছে। কোথাও একটা জ্যামে আটকে গিয়েছিল।
হঠাত দেখি মাতাল ড্রাইভার সামনের গাড়িগুলোকে ওভারটেক করবে বলে মেন রোডে পড়েই রং সাইড দিয়ে বাস নিয়ে সাইসাই করে চলতে শুরু করলো। রাত্তির বেলা। উল্টো দিক থেকে মালবাহী লরি আসছে বড় বড়। তাদের মধ্যে দিয়ে চালাচ্ছে। বাসের লোকজন কুল বসে আছে। একদম নর্মাল ব্যাপার যেন। আমি তো ভয়ে আদ্দেক হয়ে গিয়েছি। এই গেল বুঝি! হয়ে গেল কলকাতায় ফেরা। সোজা ওপরে যেতে হবে এবার।

ভগবান বোধহয় আছেন, কারণ কি, এক্সিডেন্টটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। বাসের লোকজনও অদ্ভূত রকমের নির্বিকার এ নিয়ে। যেন জানতই যে যতই ভয়ংকরভাবে বাস চালাক, কিছুই হবে না। আমি এই নির্বিকারভাব দেখে মাঝেমধ্যে খুব অবাক হয়ে যাই।
এই প্রসঙ্গে আরেকটা ঘটনা মনে পড়ল। একবার বেনারসের রাস্তায় খুব জোরে সাইকেল চালিয়ে ব্রেক কষতে না পেরে একটা মোপেডকে জোর ঠুকে দিয়েছিলাম। এটা যদি কলকাতার রাস্তা হত, ওখানেই আমাকে মেরে খগেন বানিয়ে দিতো। লোকটা দেখি অদ্ভূত নির্বিকারভাবে উঠে পড়ে “আরে ভাইয়া তোড়-ফোড় দোগে ক্যা?” বলে নির্বিকারভাবেই চলে গেল।

যাইহোক বাসের ঘটনায় ফিরে আসি। বাস বেশ নির্বিঘ্নেই হাইওয়ে পেরোলো। কন্ডাক্টার পিছনের সিটে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশে হেল্পার ছেলেটাকে পাঁচ টাকা দিয়ে বলেছে টোল এলে টাকা দিয়ে দিতে। গাড়ি চলতে চলতেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোকের হাতে পাঁচ টাকা গুঁজে দিতে হবে। হেল্পারও পাঁচ টাকাটা জানলা দিয়ে ঝুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। টোল পেরিয়ে গেল। হেল্পার কন্ডাক্টার ঘুমিয়ে কাদা। হটাঠ দেখা গেল একটা লোক বাসের পিছনে ছুটছে “আরে প্যাসা নেই দিয়া, প্যাসা নেই দিয়া!”
ড্রাইভার বাস থামিয়ে কন্ডাকটারকে হাঁক পাড়ল “ওয়ে প্যাসা কাহে নেহি দিয়া রে?” কন্ডাক্টার তড়াক করে লাফিয়ে উঠে নেমে গিয়ে পয়সা দিয়ে এলো। তারপর হেলপারের মাথায় চাঁটি মারতে লাগলো “এএহহহ বাবুয়া শো রহ হ্যায়! প্যাসা না দেকে শো রহ হ্যায়!” ঠাস্ ঠাস্ ঠাস্!

হেল্পার মাথায় হাত বোলাচ্ছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ঘুম চোখে কিছুই বুঝতে পারছে না। ড্রাইভার সারাটা রাস্তা মদ খাওয়া গলায় গোঙাতে গোঙাতে বাস চালাতে লাগলো “প্যাসা না দেকে দোনো শো গয়ে! প্যাসা না দেকে দোনো শো গয়ে! গ্যাঁ গোঁ গ্যাঁ গোঁ গ্যাঁ গোঁ…….”

শেষ পর্যন্ত বাসটা মোগলসরাইতে পৌঁছালো। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। পাঁচটাকা-দশটাকা হিংসুটে লোকটা মাঝরাস্তায় নেমে গেছে। একটা পয়সাও দেয়নি। হেল্পার কন্ডাক্টার পিছনের সিটে এ-ওর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। মহাদেব তাদেরকে আড়চোখে দেখতে দেখতে নেমে গেল।

ড্রাইভার তখনো গ্যাঁ গোঁ করে যাচ্ছে “কোই প্যাসা নেই দিয়া| কোই নেই……….”

Advertisements

4 Comments (+add yours?)

  1. Saptarshi Das
    Jul 07, 2014 @ 03:50:49

    besh valo laglo 🙂
    amader jibone erokom prochur choto-khato ghotona ghote.. jegulo thk intended noi.. ba amra hoito chaibo o na ero ek bar ghotuk..but still, ei ghotona guloi pore kokhno obosor somoye pone porle ekta onno rokom feel-good lage!! 🙂

    Reply

  2. Koyel
    Jul 08, 2014 @ 15:41:31

    আবার তোমার দারুণ একটা লেখা পড়লাম। খুবই মজাদার ।পড়তে পরতে তো বেশ কয়েকবার জোরে হেসেও দিয়েছি।সাব্বাস! bro….u keep on writing….

    Reply

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: